এফএওর প্রতিবেদন

মার্চে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বেড়েছে ২.৪%

আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম টানা দ্বিতীয় মাসের মতো বেড়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তাদের সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে জানায়, গত মার্চে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে এ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে। খবর হেলেনিক শিপিং নিউজ।

সম্প্রতি ইতালির রোমভিত্তিক সংস্থা এফএও তাদের মাসিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। সংস্থাটি বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া খাদ্যপণ্যগুলোর দাম পর্যবেক্ষণ করে। এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কেনাবেচা হওয়া খাদ্যপণ্যের দাম মার্চে বেড়ে গড়ে ১২৮ দশমিক ৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এ দাম কেবল গত মাসের তুলনায় বেশি নয়, বরং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ শতাংশ বেশি। খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও সারের চড়া দাম কৃষকদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে।

সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চে দানাদার খাদ্যের মূল্যসূচক ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গমের দাম, যা আগের মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও অস্ট্রেলিয়ায় চাষাবাদ খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গমের বাজার চড়া ছিল। তবে বাজারে ভুট্টা সরবরাহ প্রচুর থাকায় এর দাম খুব একটা বাড়েনি। অন্যদিকে চালের বাজারে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ৩ শতাংশ কমেছে। প্রধানত নতুন ধান কাটা শুরু হওয়া এবং কিছু দেশে আমদানি চাহিদা কমে যাওয়ায় চালের বাজার নিম্নমুখী ছিল।

এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো তোরেরো বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে বর্তমানে খাদ্যের দাম কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে কৃষকদের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। সারের উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকরা হয়তো সারের ব্যবহার কমিয়ে দেবেন অথবা কম জমিতে চাষ করবেন। ফলে ভবিষ্যতে ফলন কমে যেতে পারে, যা ২০২৬ সালের শেষভাগ এবং ২০২৭ সালের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।’

মার্চে ভোজ্যতেলের বাজার ছিল সবচেয়ে উত্তপ্ত। এফএওর ভোজ্যতেল মূল্যসূচক ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। পাম, সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেলের দাম বাড়ার প্রধান কারণ ছিল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বায়োফুয়েল বা জৈব জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যায়, যা ভোজ্যতেলের বাজারকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

মার্চে চিনির বাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। আগের মাসের তুলনায় চিনির দাম ৭ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বের প্রধান চিনি রফতানিকারক দেশ ব্রাজিল চিনি উৎপাদনের চেয়ে ইথানল উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় বাজারে চিনির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও ভারত ও থাইল্যান্ডে চিনির ফলন ভালো হয়েছে, তবু ব্রাজিলের এ সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

একইভাবে মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের দামও মার্চে কিছুটা বেড়েছে। পশুখাদ্য ও পরিবহন খরচ বাড়ায় গরু ও শূকরের মাংসের দাম ১ থেকে ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। ওশেনিয়া অঞ্চলে দুধের সরবরাহ ঋতুভিত্তিক হ্রাসের কারণে গুঁড়ো দুধের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

এফএওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে রেকর্ড ৫৬৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন হতে পারে। এ বিপুল উৎপাদনে বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও ইন্দোনেশিয়া বড় অবদান রাখবে। তবে গম ও ভুট্টা উৎপাদন গত বছরের তুলনায় সামান্য কমতে পারে। সংস্থাটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো সংকটের মুখে পড়লে সার ও জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হবে। এতে উৎপাদন খরচ আরো বেড়ে গিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সামনের দিনগুলোয় বাজার ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করছে এফএও।

আরও